ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব

সাময়িকভাবে সস্তায় পণ্য পেতে পারেন ইউরোপীয় ভোক্তারা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত উচ্চ শুল্ক বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও ইউরোপীয় ভোক্তাদের জন্য এটি ইতিবাচক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত উচ্চ শুল্ক বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও ইউরোপীয় ভোক্তাদের জন্য এটি ইতিবাচক হতে পারে। উচ্চ শুল্কের কারণে ইউরোপীয় পণ্যের রফতানি কমবে। ফলে স্বাভাবিকভাবে স্থানীয় বাজারে বাড়বে জোগান। এছাড়া চীন ও জাপানের মতো দেশগুলোও উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ইউরোপকে তাদের নতুন রফতানি গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবে। ফলে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক উভয় দিক থেকে পণ্যের জোগান বাড়বে ইউরোপের দেশগুলোয়। এসব পণ্য বিক্রির জন্য ঘরোয়া বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। ফলে ইউরোপীয় ভোক্তারা সস্তায় পণ্য পেতে পারেন। অর্থাৎ বাইরের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ইউরোপের ভেতর সাময়িকভাবে মূল্য কমার চাপ তৈরি হতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্যে গত বুধবার ব্যাপক পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপের ঘোষণা দেন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যান্য অঞ্চলের মতো ইউরোপীয় ভোক্তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। শুল্ক ঘোষণার পর শেয়ারবাজারে ওঠানামা শুরু হয়েছে। যেসব কোম্পানি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো বর্তমানে বাড়তি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এর চেয়েও বেশি শুল্কের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চীন (৩৪ শতাংশ), জাপান (২৪ শতাংশ), ভারতসহ (২৬ শতাংশ) আরো কয়েকটি দেশ। যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের রফতানি পণ্যের ওপর সবচেয়ে কম, অর্থাৎ ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তবে কানাডা ও মেক্সিকো যদি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির (ইউএসএমসিএ) নিয়ম মেনে পণ্য রফতানি করে, তাহলে তাদের কোনো শুল্ক দিতে হবে না।

নতুন এ শুল্কনীতির জন্য রফতানিকারকরা ক্ষতির সম্মুখীন হলেও হোয়াইট হাউজের সিদ্ধান্ত সাধারণ ভোক্তাদের জন্য তেমন ক্ষতির কারণ নাও হতে পারে। বরং এ কারণে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের দাম আরো সস্তা হতে পারে। ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে যত পণ্য রফতানি করছে, তার চেয়ে অনেক কম আমদানি করছে। যাকে ট্রেড সারপ্লাস বা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বলা হয়। ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি করেছে ৫০ হাজার ৩৮০ কোটি ইউরো। আমদানি করেছে ৩৪ হাজার ৭২০ কোটি ইউরো মূল্যের পণ্য। ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৬৬০ কোটি ইউরো।

সেবা খাতে চিত্রটা ভিন্ন। এ খাতে ইউরোপের আমদানির পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭৩০ কোটি ইউরো। অন্যদিকে রফতানি হয়েছে মাত্র ৩১ হাজার ৮৭০ কোটি ইউরোর। ইউরোপ যেসব সেবা আমদানি করে, তার একটি বড় অংশই আসে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো থেকে।

তবুও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্যে ইউরোপের উদ্বৃত্ত থাকে থাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ইউরোপীয় পণ্যের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় ক্ষতির মুখে পড়বেন রফতানিকারকরা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইউরোপীয় পণ্য এখন ২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হবে। ফলে বাজার প্রতিযোগিতায় এসব কোম্পানি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

উদাহরণ হিসেবে ইতালির পারমিজিয়ানো রেজিয়ানো চিজ বা ফ্রান্সের এক বোতল ওয়াইন এখন মার্কিন ভোক্তাদের ২০ শতাংশ বেশি দামে কিনতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় গাড়ি কোম্পানিগুলো আরো বড় ধাক্কা খেতে পারে। কারণ গাড়ির ওপর আগেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা ছিল। এখন আরো ২০ শতাংশ যোগ হলে গাড়িগুলো এতটাই দামি হয়ে যাবে যে সেগুলো মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। এমনকি হয়তো শোরুম থেকেই সরিয়ে ফেলা হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট রফতানির প্রায় ১২ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। দাম বাড়ার ফলে রফতানির পরিমাণ কমে গেলে নতুন বাজার তৈরি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। নতুন বাজার তৈরির আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় এসব পণ্যের অভ্যন্তরীণ মজুদ বাড়বে। যার অর্থ অতিরিক্ত পণ্য ঘরোয়া বাজারে বিক্রি করার চেষ্টা হবে, যা দাম কমাতে ও ছাড় দিতে কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করতে পারে। স্বল্পমেয়াদে কোম্পানিগুলো বেশি পণ্য বিক্রির জন্য ঘরোয়া বাজারে প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে। ফলে ইউরোপীয় ভোক্তারা সস্তায় পণ্য পেতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মূলত কয়েকটি প্রধান খাত থেকে আসে—ওষুধ (৫ হাজার ৭০০ কোটি ইউরো), যানবাহন (৪ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো), বিলাসবহুল পণ্য (৮০০ কোটি ইউরো) ও পানীয় (৮০০ কোটি ইউরো)। যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা কমে যায়, তবে এসব খাতে বিক্রি না হওয়া পণ্যও অভ্যন্তরীণ বাজারে জোগান বাড়াবে। এতে স্বল্পমেয়াদে ইউরোপীয় ভোক্তারা ওষুধ, গাড়ি, পোশাক ও খাদ্যপণ্যে সস্তা দামে পেতে পারেন।

সাম্প্রতিক বছরে ইউরোপে মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ ছিল উচ্চ জ্বালানি খরচ। কারণ ইউরোপ জ্বালানি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে জ্বালানি আমদানির কারণে ৩৪ হাজার ৬০০ কোটি ঘাটতি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর তেল ও গ্যাসের দাম কমেছে। ফলে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে ইউরোর মান বেড়েছে। যেহেতু ইউরোপে মার্কিন পণ্যের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম, তাই এ বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও ইউরোপীয় ভোক্তারা স্বল্পমেয়াদে উপকৃত হতে পারেন।

আরও